এপস্টিন নেটওয়ার্ক: ছায়ায় ঢাকা প্রভাবশালীদের তালিকা ও গুরুতর অভিযোগ
কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন কেবল একাকী অপরাধী ছিলেন না; বরং তাঁর চারপাশে ছিল বিশ্বের রাজনীতি, বিনোদন এবং ব্যবসা জগতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের এক বিশাল বলয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আদালত কর্তৃক প্রকাশিত নথিতে এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন কিছু নাম, যা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রু এই মামলার সবচেয়ে বিতর্কিত নামগুলোর একটি। ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জুফ্রে অভিযোগ করেছেন যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকাকালীন এপস্টিন তাঁকে লন্ডনের একটি বাড়িতে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হতে বাধ্য করেছিলেন। যদিও অ্যান্ড্রু শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন, তবে বিতর্কের মুখে তাঁকে তাঁর সামরিক উপাধি এবং রাজকীয় দায়িত্ব থেকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতি নিতে হয়েছে।
মার্কিন রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নামও এই তালিকায় বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানে ক্লিনটন একাধিকবার যাতায়াত করেছেন। যদিও ক্লিনটনের দাবি তিনি এপস্টিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন না এবং ২০০৩ সালের পর তাঁর সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না, তবে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এমন বিতর্কিত ব্যক্তির ব্যক্তিগত দ্বীপে বা বিমানে তাঁর ভ্রমণ নিয়ে এখনো জনমনে তীব্র সংশয় ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও এই তালিকায় এসেছে, কারণ একসময় এপস্টিন ও ট্রাম্পের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে তাঁরা একে অপরের সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন। তবে ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ২০০৪ সালের দিকে এপস্টিনের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং এরপর থেকে তাঁদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না। নথিতে তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি যৌন অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।
হার্ভার্ডের বিখ্যাত অধ্যাপক এবং আইনজীবী অ্যালান ডারশোভিৎজ একসময় এপস্টিনের প্রধান আইনি উপদেষ্টা ছিলেন। ভার্জিনিয়া জুফ্রে তাঁর বিরুদ্ধেও শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে ডারশোভিৎজ এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন এবং পরবর্তীতে জুফ্রের বিরুদ্ধে পাল্টা মানহানির মামলাও দায়ের করেছিলেন।
তালিকায় বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের নাম আসায় বিশ্ববাসী অবাক হয়েছিল। তবে তদন্তে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তিনি কেবল একটি বিজ্ঞান সেমিনারে অংশ নিতে এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে গিয়েছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অনৈতিক কাজের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এছাড়া জাদুকর ডেভিড কপারফিল্ড এবং মডেল এজেন্ট জঁ-লুক ব্রুনেলের নামও বিভিন্ন নেতিবাচক প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে।
তদন্তকারী এবং সাংবাদিকদের মতে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত। প্রথমত, সরাসরি অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর যৌন নিপীড়নে লিপ্ত হওয়া। দ্বিতীয়ত, এপস্টিনকে বিভিন্ন আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করা। এবং তৃতীয়ত, ব্ল্যাকমেইলিং—যেখানে অভিযোগ রয়েছে যে এপস্টিন তাঁর প্রভাবশালী বন্ধুদের গোপন ভিডিও ধারণ করে রাখতেন যাতে পরবর্তীতে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যদিও নথিতে নাম থাকা মানেই সরাসরি অপরাধী হওয়া নয়, তবে এটি প্রমাণ করে যে এপস্টিন তাঁর অপরাধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে সুকৌশলে সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিদের সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে তুলেছিলেন।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে