রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে খামেনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় এসব উসকানিদাতা হাজারো মানুষের হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল। তিনি বলেন, অতীতের মতো এবারও ইরানি জনগণ তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেবে।
অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন গত তিন বছরের মধ্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় গণআন্দোলনে পরিণত হয়। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা কঠোর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের ফলে বিক্ষোভ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইএসএনএ’র তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর রোববার থেকে স্কুলগুলো পুনরায় চালু হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষাও নির্ধারিত সময়ের এক সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হবে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, যেসব ঘটনাকে তারা ‘দাঙ্গা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি স্থিতিশীল। রাষ্ট্রপন্থী গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, এ সময় হাজারো মানুষকে আটক করা হয়েছে।
খামেনি তার বক্তব্যে বলেন, দেশকে কোনো যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার ইচ্ছা তাদের নেই, তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও দাবি করেন, এসব ঘটনার পেছনে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের ভূমিকা রয়েছে, যারা আরও বিপজ্জনক।
এই ভাষণেই প্রথমবারের মতো খামেনি ইঙ্গিত দেন যে, সাম্প্রতিক সহিংসতায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে। তার ভাষায়, এসব হত্যাকাণ্ড ছিল চরম নিষ্ঠুর ও অমানবিক।
ইরানি সরকার বরাবরই এই বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করে আসছে। তাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ অর্থনৈতিক দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলনকে বিদেশি শক্তি সহিংসতায় রূপ দিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি সম্প্রতি ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা অব্যাহত থাকলে নতুন সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেন। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে শত শত বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের কৌঁসুলি আলি সালেহি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিয়ে থাকেন। তিনি জানান, সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত ও কঠোর, এবং বহু মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, প্রায় ২০ হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হতে পারে। তবে ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দাবি করছেন, গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার।
এদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিক্ষোভ ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বাহাই সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩২ সদস্যের একটি নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার এবং ১৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে।
কঠোর ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ এখনও কার্যত অচল। মাঝে মাঝে সামান্য সংযোগ ফিরলেও দ্রুতই তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
বিদেশে পালিয়ে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিক্ষোভ চলাকালে তারা গুলির শব্দ শুনেছেন এবং সরাসরি হামলার মুখে পড়েছেন। এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, তেহরানের একটি মর্গে তিনি অসংখ্য মরদেহ দেখেছেন।
নরওয়েভিভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৪২৮ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য যাচাই করতে পেরেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছে। কিছু হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমনকি ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এদিকে বিদেশভিত্তিক বিরোধী গণমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে, সরকারি ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে অন্তত ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
বিক্ষোভ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সামাজিক মাধ্যমে নতুন কোনো যাচাইযোগ্য আন্দোলনের খবর না মিললেও, বিভিন্ন ভিডিওতে বহু এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা উপস্থিতি দেখা গেছে।
এর মধ্যেই ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহের যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছেলে রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে