66°F বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মেনু

জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: ব্যাটলগ্রাউন্ড বাংলাদেশ

বস্টন বাংলা অনলাইন ডেস্ক, Boston Bangla

প্রকাশ: ২৭ জানু ২০২৬ | নিউজটি দেখেছেন: ২২
জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: ব্যাটলগ্রাউন্ড বাংলাদেশ

রাজনীতির মোড়ে একটি রাষ্ট্রের আত্মজিজ্ঞাসা

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন কোনো সাধারণ ক্যালেন্ডারভিত্তিক রাজনৈতিক আয়োজন নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের নিজের দিকে ফিরে তাকানোর মুহূর্ত-এক ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা। শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এমন একটি নির্বাচনের মুখোমুখি, যেখানে ক্ষমতা কার হাতে যাবে-এই প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে কাঠামোর প্রশ্ন। দেশটি কীভাবে চলবে, কার ভাষায় চলবে, এবং সর্বোপরি কাদের জন্য চলবে-এই মৌলিক প্রশ্নগুলোই এবারের নির্বাচনের কেন্দ্রে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন তাই শুধু ব্যালটের হিসাব নয়। এটি আস্থার পুনর্গঠন, স্মৃতির পুনর্লিখন এবং ভবিষ্যতের একটি মানচিত্র আঁকার প্রচেষ্টা। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার একটি পরীক্ষাও বটে।

এই নির্বাচনের মানসিক রাজধানী হিসেবে উঠে এসেছে ঢাকা–গাজীপুর–নারায়ণগঞ্জ অঞ্চল। এখানে ভোটাররা আদর্শের চেয়ে জীবনের বাস্তবতায় বেশি আবদ্ধ। বাসাভাড়া, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার নীরব ভয়-এই চারটি অনুভূতি প্রতিদিন মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। ফলে এই অঞ্চলে শেষ মুহূর্তের কথাবার্তা, শেষ তিন দিনের গুঞ্জন অনেক সময় পোস্টার ও প্রচারণার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

শিল্পাঞ্চলগুলোতে রাজনীতির ভাষা আরও খোলামেলা ও বাস্তব। শ্রমিকদের কাছে ভোট মানে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; ভোট মানে আগামী মাসে কারখানা খোলা থাকবে কি না, চাঁদাবাজি থাকবে কি না, কিংবা রাস্তায় নামলে পুলিশের উপস্থিতি থাকবে কি না-এইসব সরাসরি জীবনের প্রশ্ন। এখানে স্লোগানের চেয়ে আচরণ গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিশ্রুতির চেয়ে অভ্যাসের মূল্য বেশি।

সীমান্তবর্তী ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটের ভাষা সবচেয়ে নীরব, কিন্তু সবচেয়ে গভীর। সেখানে মানুষ প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলে না-কে জিতবে। তারা প্রশ্ন করে-কে এলে আমরা নিরাপদ থাকবো? এই প্রশ্নের ভেতর জমে আছে ইতিহাস, ভয়, এবং বহু না বলা স্মৃতি, যা সিদ্ধান্তকে নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত করে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে দৃশ্যপট ভিন্ন। এখানে রাজনীতি মানে পুনরাবৃত্তি নয়, বরং পুনর্লিখন। নতুন সংবিধান, গণপরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার-এই শব্দগুলো কেবল স্লোগান নয়; এগুলো এক ধরনের ক্লান্তির ভাষা, পুরনো ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার প্রকাশ।

এই বহুমাত্রিক ব্যাটলগ্রাউন্ডে বিএনপি হাজির হয়েছে পরিচিত কাঠামো ও স্থিতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে। তাদের শক্তি সংগঠনে, অভিজ্ঞতায় এবং এই ধারণায় যে দেশকে আবার ‘চালু’ করা দরকার। তবে তরুণ ভোটারদের চোখে তারা এখনো পুরনো যন্ত্রের প্রতিনিধি হিসেবেই রয়ে গেছে।

জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট খেলছে ভিন্ন কৌশলে-উচ্চস্বরে নয়, ধীরে; স্লোগানে নয়, সার্ভিসে। ‘দুর্নীতি-শূন্য রাষ্ট্র’ তাদের মূল ব্র্যান্ড হলেও অতীতের ভার প্রতিটি বক্তব্যের পেছনে ছায়া ফেলে রাখছে।

ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি এই নির্বাচনের ভাষাগত ব্যতিক্রম। তারা ক্ষমতার চেয়ে কাঠামোর কথা বেশি বলে, সরকারের চেয়ে রাষ্ট্রের প্রশ্ন তোলে। তাদের শক্তি তরুণদের কল্পনায়, আর দুর্বলতা মাঠের বাস্তবতায়।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সরাসরি না থাকলেও, এই নির্বাচনে তারা অনুপস্থিত নয়। তাদের ভোটব্যাংক ভেঙে গেছে নীরবতায়-কোথাও স্থানীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে, কোথাও কৌশলগত সমর্থনে। এই ভাঙা স্রোতই অনেক আসনে ফলাফলের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন নির্ধারিত হবে পাঁচটি অদৃশ্য সূচকে-জীবনযাত্রার ব্যয় ও চাপ, ভোটকেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি, সংখ্যালঘু ও নারীদের আস্থার জায়গা, তরুণদের সংস্কার আকাঙ্ক্ষা, এবং সর্বোপরি নিরাপত্তার অনুভূতি।

এই নির্বাচন জিতবে সেই পক্ষ, যারা সবচেয়ে বড় কথা বলবে না; বরং যারা সবচেয়ে কম ভয় তৈরি করবে, আর সবচেয়ে বেশি আস্থা ফিরিয়ে দিতে পারবে।