কলাম | আজাদ খান
একটি গণতন্ত্রকে বোঝা যায় তার নির্বাচনের ফল দিয়ে নয়, বরং তার কথাবার্তার ধরন দিয়ে। রাষ্ট্র কীভাবে কথা বলে, নাগরিক কীভাবে দ্বিমত প্রকাশ করে, আর বিরোধী কণ্ঠকে সমাজ কতটা জায়গা দেয়—এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলোই একটি জাতির রাজনৈতিক পরিণতিকে নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশে একসময় জনবক্তব্য ছিল উত্তপ্ত কিন্তু সংযত। মতভেদ ছিল, ক্ষোভ ছিল, এমনকি তীব্র বিরোধও ছিল—তবু সেখানে এক ধরনের অদৃশ্য সীমারেখা কাজ করত। আজ সেই সীমারেখা প্রায় অদৃশ্য। টেলিভিশনের টক শো নামের আধুনিক জনচত্বরগুলো ক্রমশ এমন এক মঞ্চে রূপ নিচ্ছে, যেখানে কথা আর ভাবনার বাহন নয়, বরং আঘাতের অস্ত্র।
যখন সংলাপ রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে
টক শোর জন্ম হয়েছিল আলোচনার জন্য। সেখানে প্রশ্ন উঠবে, উত্তর খোঁজা হবে, যুক্তি যাচাই হবে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই জায়গা দখল করেছে উত্তেজনা। এখন অনেক অনুষ্ঠানে যুক্তি নয়, গলার জোরই মুখ্য। বক্তব্য নয়, ব্যক্তিই হয়ে উঠছে লক্ষ্যবস্তু।
এই রূপান্তর হঠাৎ ঘটেনি। টিআরপি নামের এক নির্দয় মাপকাঠি ধীরে ধীরে আলোচনার ভাষা নির্ধারণ করতে শুরু করেছে। দর্শক ধরে রাখার তাড়নায় বিশ্লেষণকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, জায়গা করে নিয়েছে চিৎকার। সাংবাদিকতা আর বিনোদনের মাঝের দেয়াল ভেঙে পড়েছে—আর তার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে সৌজন্যবোধ।
অপমানের ভাষা, ক্লান্ত সমাজ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অশালীনতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়—এটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। মতের বিরোধিতা করতে গিয়ে মানুষকে অপমান করা হচ্ছে, তার দেশপ্রেম, বিশ্বাস, এমনকি ব্যক্তিগত পরিচয় পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। যুক্তির অভাব ঢাকতে ভাষা হয়ে উঠছে রূঢ়, কখনো অশ্লীল।
এর চেয়েও ভয়াবহ হলো হুমকির স্বাভাবিকীকরণ। টেলিভিশনের পর্দায় উচ্চারিত কিছু বাক্য কেবল মতপ্রকাশ নয়—তা অনেক সময় ইঙ্গিতপূর্ণ ভীতি। প্রতিপক্ষকে ‘শত্রু’ বানিয়ে তোলার এই ভাষা সমাজে নীরব আগুন জ্বালায়, যা পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, কখনো বাস্তব সহিংসতায় রূপ নেয়।
তথ্যের মৃত্যু, আবেগের জয়
একটি সুস্থ আলোচনার প্রথম শর্ত হলো তথ্যের প্রতি শ্রদ্ধা। কিন্তু আজকের বহু টক শো এমন কাঠামোয় তৈরি, যেখানে তথ্যের শ্বাস নেওয়ারই সুযোগ নেই। একসঙ্গে বহু কণ্ঠ, একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা—এই বিশৃঙ্খলায় সত্য চাপা পড়ে যায়।
ফলে দর্শক ধীরে ধীরে শেখে এক অদ্ভুত পাঠ: সঠিক হওয়া জরুরি নয়, জোরে বলা জরুরি। এই মানসিকতা শুধু টেলিভিশনেই থেমে থাকে না; তা সমাজের কথাবার্তায়ও ঢুকে পড়ে।
নীরব হয়ে যাওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠ
এই পরিবেশের সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীর ক্ষতি হলো চিন্তাশীল মানুষের সরে যাওয়া। শিক্ষাবিদ, গবেষক, অভিজ্ঞ প্রশাসক কিংবা দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এখন অনেকেই এই মঞ্চে আসতে চান না। কারণ তারা জানেন, এখানে যুক্তির মূল্য কম, অপমানের ঝুঁকি বেশি।
ফলে জনপরিসর ভরে উঠছে উচ্চকণ্ঠে, কিন্তু শূন্য হয়ে যাচ্ছে গভীরতায়। সমাজ হারাচ্ছে ভারসাম্য।
গণতন্ত্রের আত্মা কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়
গণতন্ত্র কেবল প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক ধরনের আচরণবিধি। যখন সেই আচরণবিধি ভেঙে পড়ে, তখন মানুষের বিশ্বাসও ভাঙতে শুরু করে। রাজনৈতিক আলোচনা যদি কেবল বিশৃঙ্খল ও আক্রমণাত্মক হয়, নাগরিক তখন ধীরে ধীরে যুক্তিপূর্ণ পথের ওপর আস্থা হারায়।
এই ক্লান্তি থেকেই জন্ম নেয় কর্তৃত্ববাদী আকাঙ্ক্ষা—“এভাবে কথা বলার চেয়ে শক্ত হাতে সব থামিয়ে দেওয়া ভালো।” ইতিহাস বলে, এই ভাবনা কখনো শুভ ফল বয়ে আনে না।
ভদ্রতা: দুর্বলতা নয়, শক্তি
ভদ্রতা মানে আপস নয়। সৌজন্য মানে দ্বিমত এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং এটি এমন এক শক্তি, যা ভিন্নমতকে সহাবস্থানের সুযোগ দেয়। বিতর্ক যত তীব্রই হোক, ভাষা যদি সংযত থাকে, সমাজ টিকে থাকে।
এখানে দায়িত্ব কেবল গণমাধ্যমের নয়, দর্শকেরও। আমরা কী দেখি, কাকে সমর্থন করি, কোন ভাষাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই—এই সব সিদ্ধান্তই ধীরে ধীরে গণমাধ্যমের চরিত্র গড়ে তোলে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের জনবক্তব্য আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে দুটি পথ। একদিকে এমন এক পাবলিক স্কয়ার, যেখানে ধারণা যুক্তিতে যাচাই হবে। অন্যদিকে এমন এক মঞ্চ, যেখানে অপমান, জেদ আর পরিচয়ই হয়ে উঠবে মূল মুদ্রা।
প্রশ্নটি এই নয় যে আমরা দ্বিমত করব কি না। প্রশ্ন হলো—আমরা কি আমাদের শালীনতা বজায় রেখেই দ্বিমত করতে পারি?
এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ভাষা।
লেখকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আজাদ খান বাংলাদেশ সরকারের সাবেক একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক নীতি এবং জননিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অবসর–পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও নাগরিক আচরণ নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।
জার্নাল নোট | Boston Bangla Journal
এই কলামটি সমকালীন বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও জনবক্তব্যের একটি গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে। Boston Bangla Journal বিশ্বাস করে, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়—এটি ভাষা, আচরণ এবং সহনশীলতার সম্মিলিত অনুশীলন। এই লেখাটি সেই বিশ্বাসেরই একটি মননশীল দলিল।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে