খামেনি হত্যাকাণ্ডে দিল্লির নীরবতা নিয়ে সোনিয়া গান্ধীর সমালোচনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারতের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। তিনি মনে করেন, নয়াদিল্লির ‘অস্বস্তিকর’ নীরবতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সর্বভারতীয় দৈনিক The Indian Express–এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে সোনিয়া গান্ধী লিখেছেন, আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে কোনো ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে গভীর ও গুরুতর ফাটল সৃষ্টি করে। তাঁর বক্তব্য, ইরানের সার্বভৌমত্বে আঘাত এবং খামেনির মৃত্যুর ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো শোকপ্রকাশ বা নিন্দা না জানানো বিস্ময়কর।
১৯৯৪ সালের কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট স্মরণ
সোনিয়া গান্ধী তাঁর লেখায় ১৯৯৪ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনার কথা স্মরণ করেন। সে সময় পাকিস্তান Organisation of Islamic Cooperation–কে (ওআইসি) সঙ্গে নিয়ে কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নেয়। তখন ইরান ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সেই প্রস্তাব ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাও পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ান। তাঁর বিশেষ উদ্যোগে অসুস্থ অবস্থায় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং গোপনে তেহরান সফর করেন। সেখানে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট আলী আকবর হাশেমি রাফসানজানি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর বেলায়েতি–র সঙ্গে বৈঠক করেন।
পরবর্তী সময়ে ওআইসির বৈঠকে পাকিস্তানের প্রস্তাব পেশের সময় ইরান আপত্তি জানায়। ইরানি প্রতিনিধি জানান, কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত। এর ফলে প্রস্তাবটি এগোয়নি।
জাতীয় ঐক্যের বার্তা
সেই সময় আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় নরসিমা রাও বিরোধী দলীয় নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী–কে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে অন্তর্ভুক্ত করেন। প্রতিনিধিদলে ছিলেন সালমন খুরশিদ, ফারুক আবদুল্লাহ ও মনমোহন সিংও। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারত যে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ—এই বার্তা দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন
সোনিয়া গান্ধীর মতে, গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্বের দাবি করা ভারত যদি কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনায় নীরব থাকে, তবে বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যেও ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হতে পারে।
খামেনি হত্যাকাণ্ড এবং ইরানের ওপর সামরিক হামলার ঘটনায় ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।
আরেকটু বড় করে দাও
খামেনি হত্যাকাণ্ডে দিল্লির নীরবতা নিয়ে সোনিয়া গান্ধীর কড়া সমালোচনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারতের নীরব অবস্থান নিয়ে সরব হয়েছেন কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি সোনিয়া গান্ধী। তিনি মনে করছেন, এমন একটি আন্তর্জাতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনায় নয়াদিল্লির ‘অস্বস্তিকর নীরবতা’ ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক The Indian Express–এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে সোনিয়া গান্ধী লেখেন, আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে কোনো ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক গভীর ও গুরুতর ফাটল তৈরি করে। তাঁর ভাষায়, এটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনার বিষয় নয়; বরং বৈশ্বিক কূটনৈতিক শৃঙ্খলা ও বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইরানের সার্বভৌমত্বে আঘাত ও খামেনির মৃত্যুর ঘটনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো শোকপ্রকাশ বা সামরিক হানার নিন্দা জানালেন না কেন। সোনিয়ার মতে, গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা ভারতের জন্য এ ধরনের নীরবতা ভবিষ্যতে কূটনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হতে পারে।
১৯৯৪ সালের কূটনৈতিক ‘থ্রিলার’ স্মরণ
সোনিয়া গান্ধী তাঁর নিবন্ধে ১৯৯৪ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অধ্যায়ের কথা তুলে ধরেন। সে সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো Organisation of Islamic Cooperation (ওআইসি)–কে ঐক্যবদ্ধ করে কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নেন। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে কাশ্মীর প্রশ্ন আবারও আন্তর্জাতিকীকরণের ঝুঁকিতে পড়ত এবং তা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ পর্যন্ত গড়াতে পারত।
তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পি ভি নরসিমা রাও। অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি, বাবরি মসজিদ ধ্বংস-পরবর্তী আন্তর্জাতিক চাপ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারত তখন কঠিন সময় পার করছিল। এই প্রেক্ষাপটে রাও কূটনৈতিকভাবে বাজি ধরেন ইরানের ওপর।
তিনি উপলব্ধি করেন, ইরান সম্মতি না দিলে ওআইসিতে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস সম্ভব নয়। আর প্রস্তাব পাস না হলে তা জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে গড়াবে না।
অসুস্থ দীনেশ সিংয়ের গোপন তেহরান সফর
রাওয়ের নির্দেশে অসুস্থ অবস্থায় তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং গোপনে তেহরান সফর করেন। সে সময় তিনি দিল্লির এইমসে ভর্তি ছিলেন। কড়া গোপনীয়তার মধ্যে তাঁকে বিশেষ বিমানে তেহরানে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট আলী আকবর হাশেমি রাফসানজানি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর বেলায়েতি–র সঙ্গে বৈঠক করেন।
কয়েক ঘণ্টার আলোচনায় তিনি কাশ্মীর পরিস্থিতি ও ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। পরে জানা যায়, ইরান ইতিবাচক সাড়া দেয় এবং ওআইসির বৈঠকে পাকিস্তানের প্রস্তাব আটকে দেয়। ইরানি প্রতিনিধিরা জানান, ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হওয়া উচিত।
এই পদক্ষেপের ফলে কাশ্মীর ইস্যুর আন্তর্জাতিকীকরণ ঠেকানো সম্ভব হয়—যা তৎকালীন ভারতীয় কূটনীতির বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
জাতীয় ঐক্যের বার্তা ও কূটনৈতিক কৌশল
আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় নরসিমা রাও বিরোধী দল বিজেপির শীর্ষ নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী–কে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে অন্তর্ভুক্ত করেন। প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন সালমন খুরশিদ, ফারুক আবদুল্লাহ ও মনমোহন সিং। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বার্তা দেওয়া হয় যে, জাতীয় স্বার্থে ভারত রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে ঐক্যবদ্ধ।
বর্তমান বিতর্ক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন
সোনিয়া গান্ধীর মতে, যে ইরান একসময় ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেই দেশের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডে ভারতের নীরবতা কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে যদি ভারত সঠিক সময়ে বৃহৎ শক্তির একতরফা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কথা না বলে, তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আস্থায় ফাটল ধরতে পারে।
খামেনি হত্যাকাণ্ড, ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান—এই তিন ইস্যু ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে