অর্ধশতাব্দী পর আবার চাঁদের পথে মানুষ: নতুন মহাকাশ প্রতিযোগিতায় নাসার আর্টেমিস মিশন
চাঁদের বুকে মানুষের সর্বশেষ পা পড়েছিল ১৯৭২ সালে। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী। এই সময়ের মধ্যে আর কোনো মানুষ চাঁদে অবতরণ করেনি। তবে সেই নীরবতা ভাঙতে চলেছে আবারও। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী দশকের মধ্যেই চাঁদে ফিরতে পারে মানুষ।
বিশ্বজুড়ে নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে মহাকাশ প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থা এখন চাঁদকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল সাজাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চাঁদে মানুষের উপস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ আন্তঃগ্রহ অভিযানের প্রস্তুতি।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচির আওতায় আবার মানুষকে চাঁদের পথে পাঠাতে প্রস্তুত হচ্ছে। এই কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপ ‘আর্টেমিস–২’ মিশনের মাধ্যমে চারজন নভোচারী চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। এটি হবে অর্ধশতাব্দীর মধ্যে মানুষের প্রথম চন্দ্রাভিযান।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই মিশনটি সফল হলে ২০৩০ সালের মধ্যে আবারও চাঁদের মাটিতে মানুষের পা পড়তে পারে। আর্টেমিস প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কেবল চাঁদে যাওয়া নয়; বরং সেখানে একটি কক্ষপথভিত্তিক মহাকাশ স্টেশন—‘লুনার গেটওয়ে’—স্থাপন করা, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতিক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
আর্টেমিস–২ মিশনে অংশ নিচ্ছেন নাসার তিন নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। প্রায় ১০ দিনের এই অভিযানে তাঁরা ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান ও স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেটের সক্ষমতা পরীক্ষা করবেন।
এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য হলো গভীর মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করা।
এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরে সম্পন্ন হয় আর্টেমিস–১ মিশন, যেখানে কোনো মানুষ ছাড়াই একটি ওরিয়ন ক্যাপসুল চাঁদ প্রদক্ষিণ করে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসে।
মানুষ প্রথম চাঁদে পা রাখে ১৯৬৯ সালে, অ্যাপোলো–১১ মিশনের মাধ্যমে। ওই অভিযানে নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটেন। পরবর্তী তিন বছরে মোট ছয়টি মনুষ্যবাহী মিশনে ১২ জন নভোচারী চাঁদে অবতরণ করেন।
এই অভিযানের সময় তাঁরা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালান, চাঁদের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৩৮০ কেজি শিলা ও মাটি সংগ্রহ করে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন। তবে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে অ্যাপোলো–১৭ মিশনের মাধ্যমে এই অধ্যায়ের ইতি ঘটে। সেই অভিযানের কমান্ডার ইউজিন সারনানই ছিলেন চাঁদের শেষ মানব অতিথি।
চন্দ্রাভিযানের ইতিহাসে অ্যাপোলো–১৪ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এই মিশনটি এমন এক সময়ে পরিচালিত হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মহাকাশ কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। আগের মিশনের দুর্ঘটনা ও ব্যয়বহুল প্রকল্প নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে নাসা।
অভিযানের নেতৃত্ব দেন অ্যালান শেপার্ড, যিনি প্রথম মার্কিন হিসেবে মহাকাশে যাত্রা করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্টুয়ার্ট রুসা ও এডগার মিচেল। নানা প্রযুক্তিগত জটিলতা ও সীমিত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তাঁরা সফলভাবে চাঁদে অবতরণ করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেন।
এই মিশনের সময় চাঁদের অভ্যন্তরীণ গঠন বোঝার জন্য বিশেষ কম্পন পরীক্ষা চালানো হয়। যদিও কিছু বৈজ্ঞানিক সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি বলে সমালোচনা রয়েছে, তবু অ্যাপোলো–১৪ প্রমাণ করে দেয়—মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যেও চাঁদে কাজ করতে সক্ষম।
দীর্ঘ বিরতির পর আর্টেমিস কর্মসূচির মাধ্যমে চাঁদে ফেরার প্রস্তুতিকে অনেকেই মহাকাশ গবেষণার নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে চীনের দ্রুত অগ্রসরমান মহাকাশ কর্মসূচির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কৌশলগত লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদে মানুষের প্রত্যাবর্তন শুধু বৈজ্ঞানিক অর্জন নয়; এটি ভবিষ্যৎ মহাকাশ রাজনীতি, প্রযুক্তি ও মানব সভ্যতার বিস্তারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে