89°F রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মেনু

রুপালি পর্দার নায়ক থেকে মানুষের নায়ক—ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবন এখন এক কঠিন লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক, Boston Bangla

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | নিউজটি দেখেছেন: ৬
রুপালি পর্দার নায়ক থেকে মানুষের নায়ক—ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবন এখন এক কঠিন লড়াই

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ইলিয়াস কাঞ্চন শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক নন, তিনি একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। রুপালি পর্দায় রোমান্টিক নায়ক থেকে জীবনঘনিষ্ঠ চরিত্র—বহুমাত্রিক অভিনয়ে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। আর পর্দার বাইরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছেন একজন সমাজসচেতন মানুষ। আজ সেই প্রিয় অভিনেতা জীবনের আরেক কঠিন অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলেও তার চিকিৎসা এখনো শেষ হয়নি।

১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে জন্ম ইলিয়াস কাঞ্চনের। মঞ্চনাটকের মাধ্যমে অভিনয়ের জগতে আগ্রহ তৈরি হয় তার। এরপর নির্মাতা সুভাষ দত্তের হাত ধরে ১৯৭৭ সালে ‘বসুন্ধরা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক। এ ছবিতে তার বিপরীতে ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। এরপর ‘ডুমুরের ফুল’, ‘সুন্দরী’, ‘শেষ উত্তর’, ‘অভিযান’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।

তবে ইলিয়াস কাঞ্চনের ক্যারিয়ারের প্রকৃত উত্থান ঘটে আশির দশকের মাঝামাঝি। ১৯৮৬ সালে ‘পরিণীতা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার স্বীকৃতি পান। পরবর্তী সময়ে ‘ভেজা চোখ’, ‘দুই জীবন’সহ একাধিক দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রে তার অভিনয় তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। ২০০৫ সালে ‘শাস্তি’ চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্যও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।

ইলিয়াস কাঞ্চনের চলচ্চিত্র জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি ‘বেদের মেয়ে জোছনা ১৯৮৯ সালের ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক। ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং ইলিয়াস কাঞ্চনকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও পরিচিত করে তোলে।
নায়ক হিসেবে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি রোমান্টিক, সামাজিক ও পারিবারিক নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের স্বীকৃতিও পেয়েছেন বিভিন্ন পুরস্কারে। একসময় যে মানুষটির ব্যস্ততা ছিল শুটিং, সিনেমা হল, দর্শক ও চলচ্চিত্রকে ঘিরে, সময়ের পরিবর্তনে তাঁর জীবনের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে একজন সামাজিক আন্দোলনের কর্মী হিসেবে।
নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে নতুন পরিচয় ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে ব্যক্তিগত এক শোকাবহ ঘটনার পর। সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যুর পর তিনি নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার হন। পরবর্তীতে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’—নিসচা নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে আসছেন।
চলচ্চিত্রের নায়ক থেকে সড়ক নিরাপত্তার আন্দোলনের মুখপাত্র—এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জনজীবনে তাঁর আলাদা একটি পরিচয় তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চালক, যাত্রী, পথচারী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং সরকারের প্রতি সড়ক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
সাম্প্রতিক সময়েও তাঁর এই ভূমিকা অব্যাহত রয়েছে। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে আগের মতো সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকতে পারছেন না। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, সুস্থ হয়ে আবার মানুষের সঙ্গে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার শক্তি পাওয়ার প্রত্যাশার কথা।

যুক্তরাজ্যে ১৫ মাসের বেশি সময়ের চিকিৎসা শেষে গত সোমবার দেশে ফিরেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে গত বছরের এপ্রিল থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে চিকিৎসা নিয়েছেন তিনি। সেখানকার হাসপাতাল ও মেয়ে ইমা ইসলামের বাসায় থেকে তাঁর চিকিৎসা চলে। গত বছরের আগস্টে লন্ডনের একটি হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা টিউমারের একটি বড় অংশ অপসারণ করলেও ঝুঁকির কারণে পুরো টিউমার সরাতে পারেননি। পরে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর ব্রেন ক্যানসারের কথা।

অস্ত্রোপচার শেষে ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসা শুরু হয়। প্রথম ধাপে টানা তিন মাস কেমোথেরাপি নেওয়ার পাশাপাশি দ্বিতীয় ধাপে ওরাল থেরাপি চলে।

পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, সপ্তাহে পাঁচ দিন করে ১২ সপ্তাহের চিকিৎসার মধ্যে প্রায় ৬০টির বেশি কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে এই অভিনেতাকে। এরপর তিন মাসের প্রথম ধাপের ওরাল থেরাপি শেষ করে তিনি দ্বিতীয় ধাপের আরও তিন মাসের ওরাল থেরাপি নিয়েছেন। তিন ধাপে সব মিলিয়ে মোট শখানেক কেমোথেরাপি নিয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন।