জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে নতুন করে চাপে পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে আবাসিক গ্রাহক থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান—প্রায় সব শ্রেণির ভোক্তারই ব্যয় বেড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন দরে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে এলপিজির দামও বাড়ানো হয়েছে। এর পর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন আদেশ অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম ইউনিটপ্রতি ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৫২ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এর বহুমুখী প্রভাব নিয়ে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য বাজারে আনতে খরচ বাড়ে। ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানির বিলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে। যেসব পরিবার সীমিত আয়ের মধ্যে বিদ্যুৎ, রান্নার জ্বালানি, যাতায়াত ও খাদ্য ব্যয় সামাল দেয়, তাদের মাসিক বাজেটে অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ খুবই কম। বিদ্যুতের দাম বাড়ার পাশাপাশি বাজারে অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়তে থাকলে এসব পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্প খাতেও এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় উৎপাদন খরচের অন্যতম উপাদান। বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। এতে একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে, অন্যদিকে উৎপাদন ও বিনিয়োগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন মহলে প্রশ্নও উঠেছে। তাদের বক্তব্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে অদক্ষতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার দায় সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপানো উচিত নয়। বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়েও কার্যকর পর্যালোচনা প্রয়োজন।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজনৈতিক কর্মসূচিও দেখা গেছে। বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনদুর্ভোগ বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় শুধু দাম বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় অপচয় কমানো এবং জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
জনগণের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা না চাপিয়ে কীভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়—এখন সেটিই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রতিটি ধাক্কাই শেষ পর্যন্ত গিয়ে লাগে সাধারণ মানুষের সংসারের বাজেটে।
আপনার বিজ্ঞাপন এখানে